তারাবী বিশ রাকাত পড়া সুন্নত(৩য় পর্ব)

ইয়াযীদ ইবনে খুসায়ফা সম্পর্কে জালিয়াতি:

ইয়াযীদ ইবনে খুসায়ফা র. সম্পর্কে তো তাদের বক্তব্য আরো জঘন্য। ইয়াযীদ ছিলেন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী, সিহাহ সিত্তার রাবী। বুখারী র. ও মুসলিম র. তার সূত্রে বহু হাদীস গ্রহণ ও উদ্ধৃত করেছেন। আবূ হাতিম, নাসায়ী ও ইবনে সাদ তাকে ছিকাহ বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইবনে মাঈন বলেছেন, ثقة حجة অর্থাৎ তিনি নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণযোগ্য। আছরাম এর বর্ণনা মতে ইমাম আহমাদও তাকে ছিকাহ বলেছেন। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেছেন, মুনকারুল হাদীস। এই শব্দটির অর্থ হয়তো তারা করেছেন প্রত্যাখ্যাত। আর তার সকল বর্ণনা কথাটি নিজেদের পকেট থেকে জুড়ে দিয়েছেন। অথচ ঐ শব্দটির সাধারণ অর্থ আপত্তিকর হাদীস বর্ণনাকারী। কেউ কেউ বলেছেন, যদি এমন কোন বর্ণনাকারী হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ হন, যার নিঃসঙ্গ বর্ণনা গ্রহণ করা যায় না, তার ক্ষেত্রেই কেবল ইমাম আহমাদ ঐ শব্দ ব্যবহার করেন। ফাতহুল বারীর ভূমিকা গ্রন্থে ইবনে হাজার র. ইয়াযীদের আলোচনাতেই এই কথা পরিস্কার করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ইমাম আহমদ ও অন্যান্য মুহাদ্দিসের মতো ঐ রাবীর ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহার করেছেন যার থেকে কিছু কিছু ভুল প্রকাশিত হয়েছে।

🌍আবু উসমান প্রখ্যাত হাফেজে হাদীস ছিলেন

বাকি রয়ে গেলেন আবু উসমান। তিনি অস্বীকৃত: এমন কোন কথা কোন কিতাবে নাই। মুবারকপুরী বলেছেন, আমিও দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে তার জীবনী সম্পর্কে কিছু উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু এ ব্যর্থতা তাঁর। যারা খুঁজে পেয়েছেন তারা তো আর ব্যর্থ নন। দেখুন, যাহাবী সিয়ারু আলামিন নুবালা: গ্রন্থে তার নাম এভাবে উল্লেখ করেছেন: আল ইমামুল কুদওয়া আয যাহিদ আস সালিহ আবু উসমান আমর ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে দিরহাম আন নায়সাবূরী আল গাযী আল মারূফ বিল বাসরী (১২খ. ৪৭পৃ)। তার নাম আমর ইবনে আব্দুল্লাহ (মৃত্যু ৩৩৪ হি.)। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আবূ তাহির র., হাসান ইবনে আলী ইবনে মুআম্মাল, ইবনে মানদাহ, হাফেয আবু আলী ও আবু ইসহাক আল মুযাক্কী প্রমুখ তার কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। তার বর্ণিত বহু হাদীস বায়হাকী র. তার সুনানে উদ্ধৃত করেছেন। কোন মুহাদ্দিসই তাকে যয়ীফ বলেননি। হাফেয যাহাবী র. তার ‘তারীখুল ইসলাম’ গ্রন্থেও তাকে উল্লেখ করেছেন। (৩৪/১০৯) তাযকিরাতুল হুফফায গ্রন্থে হাফেয যাহাবী ৩৩৪ হি. সনে মৃত্যুবরণকারী মুহাদ্দিসগণের আলোচনায় বলেছেন, ومسند نيسابور أبو عثمان عمرو بن عبد الله بن درهم المطوعي অর্থাৎ নিশাপুরের মুসনিদ (যার নিকট উঁচু উঁচু সনদ বিশিষ্ট বহু হাদীস ছিল) আবু উসমান ...। (৩/৮৪৭)

🌍আবু তাহির ছিলেন সুপরিচিত মুহাদ্দিস

মুবারকপুরী ও মুযাফফর বিন মুহসিন এই আবু উসমানের সূত্রে হাদীস বর্ণনাকারী আবু তাহির সম্পর্কেও একই অভিযোগ করেছেন যে, তিনি অপরিচিত ছিলেন। অথচ এই আবু তাহির হলেন ইমাম বায়হাকীর উস্তাদ। হাকেম আবু আব্দুল্লাহ অগ্রণী হয়েও তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার নাম মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মাহমিশ আয যিয়াদী। ৪১০ হিজরী সনে তার ওফাত হয়। যাহাবী তার সিয়ার (১৩/১৭৩), ইবার (১/৪২০), তারীখুল ইসলাম (৯/১৫৭) ও তাযকিরাতুল হুফফাজ (৩/১০৫১) এই চারটি গ্রন্থে তার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এছাড়া সামআনী তার আল আনসাব গ্রন্থে (৩/১৮৫) ও সুবকী তার তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা গ্রন্থে (নং ৩৪৮), হাফেজ ইবনে কাছীর তার তাবাকাতুশ শাফিইয়্যীন গ্রন্থে (১/৩৬২) ও ইবনু কাযী শুহবা তার তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাহ গ্রন্থে (নং ১৫৫) তার জীবনী আলোচনা করেছেন। তারা সকলেই বলেছেন, كان إمام أصحاب الحديث وفقيههم ومفتيهم بنيسابور بلا مدافعة তিনি ছিলেন নিশাপুরের অবিসংবাদিত মুহাদ্দিসকুল শিরোমনি, ফকীহ ও মুফতী।

এ বর্ণনার ভিন্ন আরেকটি সূত্র

তাছাড়া আবূ উসমানের সূূত্র ছাড়াও হাদীসটির যখন অন্য আরেকটি সহীহ সূত্র আছে, তাই এই সূত্রটি নিয়ে আপত্তি করে কোন লাভ নেই। পেছনে এ সূত্র সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

🌍খ. ইবনে আবূ যুবাবের বর্ণনা

হারিছ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আবু যুবাব বর্ণনা করেছেন সাইব রা. থেকে। তিনি বলেছেন, وكان القيام على عهد عمر ثلاثة وعشرين ركعة উমর রা.এর যুগে কিয়ামে রমযান বা তারাবীহ ছিল ২৩ রাকআত। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হা. ৭৭৩৩)

এর সনদে হারিছ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আবু যুবাব আছেন। (মুযাফফর বিন মুহসিন লিখেছেন, আবু যুবাব নামে একজন মুনকার রাবী আছে। এটা ভুল।) তাঁর সম্পর্কে ইবনে মাঈন বলেছেন, তিনি প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। আহমদ ইবনে সালিহ তাঁকে বিশ্বস্ত বলেছেন। ইবনে হিব্বান তাকে ছিকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি ও হাকেম তার হাদীসকে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন। যাহাবী মীযান ও মুগনী গ্রন্থে তাকে বিশ্বস্ত আখ্যা দিয়েছেন। ইবনে হাজার তাকরীব গ্রন্থে বলেছেন, صدوق يهم তিনি সাদূক বা সত্যনিষ্ঠ ছিলেন, তবে ভুলের শিকার হতেন। অথচ এই রাবী সম্পর্কে মুযাফফর বিন মুহসিন শুধু বিরূপ সমালোচনাগুলোই উল্লেখ করে গেছেন।

এই হাদীস থেকে স্পষ্ট হলো, হযরত উমর রা. এর আমলে তাঁরই ব্যবস্থাপনায় সাহাবায়ে কেরাম -যাদের মধ্যে মুহাজির ও আনসার সকলেই ছিলেন- মসজিদে নববীতে বিশ রাকাত তারাবী পড়তেন। এতে তাঁদের কেউ কোন আপত্তি করেননি। এটাকেই সাহাবীগণের ইজমা বা সম্মিলিত কর্মপন্থা বলা হয়।

🌍গ. আবুল আলিয়ার বর্ণনা

আবুল আলিয়া বর্ণনা করেছেন,

أن عمر أمر أبيا أن يصلي بالناس في رمضان فقال: إن الناس يصومون النهار ولا يحسنون أن يقرأوا فلو قرأت القرآن عليهم بالليل فقال: يا أمير المؤمنين! هذا شيئ لم يكن فقال: قد علمت ولكنه حسن فصلى بهم عشرين ركعة.

অর্থাৎ উমর রা. উবাই রা.কে রমযানে লোকদের নিয়ে নামায পড়তে আদেশ দিলেন এবং একথা বললেন যে, লোকেরা দিনভর রোযা রাখে, তারা সুন্দর ভাবে কুরআন পড়তেও পারে না। তাই যদি আপনি রাত্রে তাদের সামনে কুরআন পড়তেন। তিনি তখন বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! একাজ তো ইতিপূর্বে হয় নি। তিনি বললেন, আমি তা জানি। তবে এটা একটা উত্তম কাজ হবে। এরপর উবাই রা. লোকদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত পড়লেন। (দ্র, আলমুখতারা, ১১৬১; কানযুল উম্মাল, ৪/২৮৪, মুসনাদে আহমাদ ইবন মানী’র বরাতে।)

এ হাদীসের সনদ হাসান।

এ হাদীসটির একজন রাবী হলেন, আবু জাফর রাযী ঈসা ইবনে আবূ ঈসা মাহান। তার কারণে আলবানী সাহেব এবং তারই অনুসরণে মুযাফফর বিন মুহসিন হাদীসটিকে যঈফ বলেছেন। এই রাবী সম্পর্কে বড় বড় হাদীসবিশারদগণের ভাল মন্তব্যগুলো চেপে রেখে তারা শুধু সমালোচনামূলক মন্তব্যগুলো উল্লেখ করে গেছেন। তাতেও আবার কাটছাট ও অর্থ বিকৃত করার ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

তারাবীহর রাকআত সংখ্যা বইয়ের ৩৮ নং পৃষ্ঠায় মুযাফফর বিন মুহসিন লিখেছেন , ইমাম আহমাদ ও নাসাঈ (রহঃ) বলেন, সে নির্ভরযোগ্য নয়। অথচ তারা বলেছেন, ليس بالقوي তিনি মজবুত নন। এছাড়া ইমাম আহমদ এও বলেছেন, صالح الحديث তিনি সঠিক হাদীস বর্ননাকারী। কিন্তু তার এ মন্তব্যটিও লেখক চেপে গেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার রহ.এর মন্তব্যটি তিনি এভাবে পেশ করেছেন: স্মৃতিশক্তিতে ত্রুটি রয়েছে। অথচ তার পুরো মন্তব্য হলো, صدوق سيء الحفظ তিনি সাদূক বা সত্যনিষ্ঠ তবে দুর্বল স্মৃতির অধিকারী। এমনিভাবে হাফেজ যাহাবীর মন্তব্য এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘তিনি তার আল কুনা গ্রন্থে বলেন, প্রত্যেক মুহাদ্দিসই তাকে অভিযুক্ত করেছেন। অথচ যাহাবী আল কুনায় তার সম্পর্কে কোন মন্তব্যই করেন নি। করবেন কী করে, তিনি নিজেই তো মুগনী গ্রন্থে বলেছেন, صدوق তিনি সত্যনিষ্ঠ। আর মীযান গ্রন্থে বলেছেন, صالح الحديث তিনি সঠিক হাদীস বর্ণনাকারী। এছাড়া আলী ইবনুল মাদীনী, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, ইবনে সা’দ, ইবনে আম্মার, আবু হাতেম রাযী, হাকেম ও ইবনে আব্দুল বার সকলেই তাকে ছিকাহ বা বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইবনে আদী আল কামিল গ্রন্থে বলেছেন, أحاديثه عامتها مستقيمة وأرجو أنه لا بأس به তার অধিকাংশ হাদীসই সঠিক, আমি মনে করি তার মধ্যে সমস্যার কিছু নেই। ইমাম বুখারী তার আলোচনা করেছেন আত তারীখুল কাবীর (নং ২৭৯০) ও আল আওসাত (নং ১৯৫৬) গ্রন্থদ্বয়ে। কিন্তু তিনি কোন বিরূপ মন্তব্য করেন নি।

🌍ঘ. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল আনসারীর বর্ণনা:

ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল আনসারী বর্ণনা করেছেন,

إن عمررض أمر رجلا يصلي بهم عشرين ركعة

অর্থাৎ হযরত উমর রা. জনৈক সাহাবীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সাহাবীদের নিয়ে বিশ রাকাত পড়তে। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৭৭৬৪।

এই বর্ণাটির সনদ সহীহ। তবে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ যেহেতু হযরত উমর রা. এর যুগ পাননি, আবার কার কাছ থেকে শুনেছেন তাও বলেননি, এই কারণে এটিকে মুনকাতি’ বা সূত্র-বিচ্ছিন্ন বলা হয়। কিন্তু যেহেতু এই ধরণের তাবেয়ীগণের উস্তাদ পর্যায়ে দুর্বল বর্ণনাকারী ছিলনা বললেই চলে, তাই তাদের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য। তদুপরি তিনি একা নন। আরো তিনজন তাবেয়ী একই সাক্ষ্য দিচ্ছেন। তাই এগুলো পূর্ববর্তী সহীহ ও অবিচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত হাদীসটির সমর্থক ও অতিরিক্ত সাক্ষী হিসেবে গণ্য হতে পারে।

কিছু আপত্তি ও তার জবাব

লা-মাযহাবী বন্ধুরা এই বর্ণনাটির ব্যাপারে সূত্রবিচ্ছিন্নতার আপত্তি ছাড়াও আরো তিনটি আপত্তি পেশ করেছেন। দুটি আলবানী সাহেবের বরাতে। অপরটি নিজেদের পক্ষ থেকে।

🌍প্রথম আপত্তি ও তার জবাব

প্রথম আপত্তিটি হলো, এই হাদীসটি হযরত উমর রা. থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত প্রতিষ্ঠিত হাদীসের বিপরীত। হাদীসটি হলো- হযরত উমর রা. উবাই বিন কাব ও তামীম দারীকে (রমযান মাসে ) ১১ রাকাত পড়ানোর নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। (মুয়াত্তা মালেক, হাদীস নং ২৫৩)।

কিন্তু পূর্বেই বলা হয়েছে, ইমাম মালেক র. এই হাদীসটি মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফের সূত্রে সাইব ইবনে ইয়াযীদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ বর্ণিত এ হাদীসে রাকাত-সংখ্যা নিয়ে তার ছাত্রদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। মালেক র. ১১ রাকাতের কথা বলেছেন। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ১৩ রাকাতের কথা বলেছেন। আর দাউদ ইবনে কায়স ২১ রাকাতের কথা বলেছেন। দাউদ ইবনে কায়স একাই যে বলেছেন তাও নয়। আব্দুর রাযযাক বলেছেন, عن داود وغيره অর্থাৎ দাউদের সঙ্গে আরো কেউ কেউ ২১ রাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন।

পক্ষান্তরে পূর্বে উল্লিখিত ইয়াযীদ ইবনে খুসায়ফার সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীসটিতে এ ধরণের মতভেদ নেই। আবার দীর্ঘ বারশ’ বছরের ইতিহাসে কোন মনীষী আট রাকাত তারাবীর প্রবক্তা ছিলেন না। এর উপর কারো আমলও ছিল না। বরং এর বিপরীতে হযরত উমর রা. এর যুগ থেকে অবিচ্ছিন্ন ধারায় বিশ রাকাত বা তার বেশী তারাবীর প্রচলন চলে আসছে। এসব কারণে অনেকে এগার রাকাতের বর্ণনাকে বর্ণনাকারীর ভুল আখ্যা দিয়েছেন। ইমাম ইবনে আব্দুল বার র. (মৃত্যু ৪৬৩ হি.) ইমাম মালেক র. এর অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও এই এগার রাকাতের বর্ণনাকে ইমাম মালেকের ভুল আখ্যা দিয়েছেন। অবশ্য ইমাম মালেকের ন্যায় ইয়াহয়া ইবনে সাঈদ কাত্তান, আব্দুল আযীয দারাওয়ার্দী ও ইসমাঈল ইবনে জাফরও ১১ রাকআতের কথা বলেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, ভুলটি ইমাম মালেকের নয়, বরং মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফের, যেমনটি মন্তব্য করেছেন কোন কোন মুহাদ্দিস। (দ্র, আওজাযুল মাসালিক, ১খ, ৩৯৪পৃ)

🌍১১ ও ২৩ এর মধ্যে সমন্বয়

তাছাড়া দুটি বর্ণনার মধ্যে কেউ কেউ সমন্বয় সাধন করেও পরস্পর বিরোধিতা দূর করেছেন। তারা বলেছেন, প্রথম দিকে যখন কেরাত খুব দীর্ঘ পড়া হতো তখন এগারো রাকাত পড়া হতো। পরে কেরাত কিছুটা হালকা করে রাকাত বাড়িয়ে বিশে উন্নীত করা হয়েছিল। তখন থেকেই বিশ রাকাত পড়ার ধারা অব্যাহত থাকে। ইমাম বায়হাকীসহ আরো কিছু মনীষী এরূপ সমন্বয়ের পক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন। বায়হাকীর পূর্বে হাফেজ দাউদীও এই সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি একথাও বলেছেন যে, উমর রা.এর ব্যবস্থাপনায় ২০ রাকআত পড়া যখন থেকে শুরু হয় তখন থেকে মুআবিয়া রা.এর যুগ পর্যন্ত ২০ রাকআত পড়া অব্যাহত থাকে। দ্র. শারহুল বুখারী, কৃত ইবনে বাত্তাল, মৃত্যু ৪৪৯ হি. (৪/১৪৮)। দাউদী মালেকী মাযহাবের বড় আলেম ছিলেন এবং তিনি নিজেও বুখারী শরীফের ভাষ্য রচনা করেছিলেন। তার ওফাত হয়েছিল ৪০২ হি. সনে। তাঁর বহু পূর্বে ইবনে হাবীব মালেকীও (মৃত্যু ২৩৮ হি.) বলেছেন, إنها كانت أولا إحدى عشرة ركعة إلا أنهم كانوا يطيلون القراءة فيه فثقل ذلك عليهم فزادوا في عدد الركعات وخففوا القراءة وكانوا يصلون عشرين ركعة غير الوتر (تحفة الاخيار ص ১৯২) অর্থাৎ প্রথমে ১১ রাকআত ছিল। কিন্তু তারা কিরাআত লম্বা করতেন। ফলে তা ভারী ঠেকতো। পরে তারা রাকআত সংখ্যা বাড়ালেন, আর কিরাআত হালকা করলেন। বেতের ব্যতীতই তারা বিশ রাকআত পড়তে লাগলেন। (তুহফাতুল আখয়ার, পৃ. ১৯২) ইবনে রুশদ, আবুল ওয়ালীদ আল বাজী, যুরকানী, মোল্লা আলী কারী ও আব্দুল হাই লক্ষেèৗভী প্রমুখও এভাবে সমন্বয় করা পছন্দ করেছেন।

🌍দ্বিতীয় আপত্তি ও তার জবাব

দ্বিতীয় আপত্তি হলো, বিশ রাকাতের এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত বিশুদ্ধ হাদীসের বিরোধী।

এখানে হযরত আয়েশা রা. বর্ণিত তাহাজ্জুদের এগারো রাকাত সম্পর্কিত হাদীসটির দিকে ইংগিত করা হয়েছে। এটি আমরা শেষ দিকে উল্লেখ করবো। সেখানেই প্রমাণিত হবে আলোচ্য হাদীসটি ঐ হাদীসের বিরোধী নয়।

🌍তৃতীয় আপত্তি ও তার জবাব

তৃতীয় আপত্তি লা-মাযহাবী বন্ধুরা করেছেন বর্ণনাকারী ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদের ব্যাপারে। এটাকে আপত্তি না বলে জালিয়াতি বললে অত্যুক্তি হবে না।

তারা বলেছেন, তাছাড়া ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদকে কেউ কেউ মিথ্যাবাদীও বলেছেন। যেমন, ইমাম আবূ হাতিম র. বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ কর্তৃক বর্ণিত কোন কথাই সত্য নয়, বরং প্রত্যাখ্যাত । কারণ সে হলো মিথ্যাবাদী। (আল জারহু ওয়াত তাদীল, ৯ম খ-; তাহযীবুত তাহযীব ৬ষ্ঠ খ-)।

হায়, হায়! ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ বিখ্যাত তাবেয়ী, ইমাম মালেকের উস্তাদ। বুখারী ও মুসলিম শরীফে তাঁর সূত্রে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তাঁর নাকি কোন কথাই সত্য নয়, তিনি নাকি মিথ্যাবাদী। কথাগুলো পড়ে কান্না আসার উপক্রম। ইলমে হাদীস আজ কোন অযোগ্য ও অশুভ লোকদের হাতে এসে পড়েছে? দুটি বরাতের কোথাও এমন কথা নেই, থাকতে পারে না। তাঁকে তো কেউ যয়ীফও বলেননি, মিথ্যাবাদী বলাতো দূরের কথা।

এজন্যই আমি সাধারণ আহলে হাদীস ভাইদের বলি, আপনারা কাদের অন্ধ অনুসরণ করছেন ভেবে দেখুন। যারা বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে এমন ডাহা মিথ্যা তথ্য পেশ করতে পারে, তারা ইমাম আবূ হানীফা র. সম্পর্কে আপনাদেরকে কত ভুল ধারণায় ফেলে রাখতে পারে।

🌍ঙ. তাবেয়ী আব্দুল আযীয ইবনে রুফাই’র বর্ণনা :

عن عبد العزيز بن رفيع قال: كان أبي بن كعب يصلي بالناس في رمضان بالمدينة عشرين ركعة ويوتر بثلاث.

অর্থ: আব্দুল আযীয ইবনে রুফাই (তারা লিখেছেন, রাফে) বলেন, হযরত উবাই ইবনে কাব রা. রমযানে মদীনা শরীফে লোকদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত পড়তেন এবং তিন রাকাত বেতের পড়তেন। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৭৭৬৬।

এ হাদীসটির অনুবাদে তারা জালিয়াতি করেছেন। ‘পড়তেন’ এর স্থলে তারা লিখেছেন ‘পড়েছেন’। অথচ সাধারণ আরবী জানা লোকও বুঝেন, كان يصلي অর্থ ‘পড়তেন’, ‘পড়েছেন’ নয়। যেহেতু ‘পড়তেন’ কথাটি নিয়মিত পড়াকে বোঝায়, আর ‘পড়েছেন’ কথাটি তা বোঝায় না, তাই এই জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এর উল্টো পরবর্তী হাদীসটিতে আছে,

عن أبي بن كعب أنه صلى في رمضان ....

অর্থাৎ হযরত উবাই ইবনে কাব রা. বলেন, তিনি রমযানে পড়েছেন ----। এখানে صلى অর্থ ‘পড়েছেন’। অথচ তারা অর্থ করেছেন- ‘আদায় করতেন’। এখানেও তারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।

তাইতো আমি বলি, বুখারী শরীফের পূর্ববর্তী অনুবাদগুলো যদি না থাকতো তবেই দেখা যেত বাবু সাহেবরা কত হাজার ভুলের শিকার হয়েছেন।

যাহোক, হাদীসটি একজন তাবেয়ীর সাক্ষ্য। তিনি উমরী যুগ পাননি। একে মুহাদ্দিসগণ মুনকাতি’ বা মুরসাল বলে থাকেন। অর্থাৎ যার সূত্র বিচ্ছিন্ন। সূত্র-বিচ্ছিন্ন হাদীসের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ এ কারণেই সতর্কতা অবলম্বন করেছেন যে, মাঝখানে কোন দুর্বল ব্যক্তি থেকে যাওয়ার আশংকা থাকে।

কিন্তু আব্দুল আযীয র. তাবেয়ী ছিলেন। তার উস্তাদগণের মধ্যে দুর্বল কেউ নাই বললেই চলে। তাছাড়া তিনি একা নন। তার মতো আরো তিনজন একই সাক্ষ্য দিচ্ছেন। অধিকন্তু এগুলো পূর্বোল্লিখিত অবিচ্ছিন্ন ও সহীহ সূত্রে বর্ণিত হাদীসটির অতিরিক্ত সাক্ষী ও সমর্থক। তাই এতে কোন অসুবিধা নেই।

এ হাদীসটির ব্যাপারেও তারা সূত্রবিচ্ছিন্নতার অভিযোগ ছাড়া আরও দুটি অভিযোগ এনেছেন। এক. এটি হযরত উমর রা. বর্ণিত হাদীসের বিরোধী। দুই. অনুরূপ এটি হযরত উবাই রা. এর সপ্রমাণিত বর্ণনার বিরোধী।

হযরত উমর রা. এর হাদীসের বিরোধী না হওয়ার বিষয়টি আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি। আর হযরত উবাই রা. এর হাদীসটি দুর্বল। তদুপরি সেটা একদিনের ঘটনা মাত্র। সুতরাং সেটির বিরোধী হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

🌍চ. তাবেয়ী ইয়াযীদ ইবনে রূমানের বর্ণনা:

عن يزيد بن رومان أنه قال: كان الناس يقومون في زمان عمر بن الخطاب في رمضان بثلاث وعشرين ركعة

অর্থ: ইয়াযীদ ইবনে রূমান র. বলেন, হযরত উমর রা. এর যুগে লোকেরা রমযান মাসে ২৩ রাকাত নামায পড়তেন। (মুয়াত্তা মালেক, ৪০)

এটিও একজন তাবেয়ীর সাক্ষ্য। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় এটিকে মুনকাতি’ বা মুরসাল বলা হয়। কারণ ইয়াযীদ ইবনে রূমান হযরত উমর রা. এর যুগ পান নি। এটিকে যয়ীফ বলা উচিত নয়। কেউ যয়ীফ বলেনও নি। সকলে মুনকাতি’ বা মুরসাল বলেছেন। অথচ লা-মাযহাবী বন্ধুরা বায়হাকী, নববী, যায়লায়ী ও আইনীর বরাতে উল্লেখ করেছেন: তারা নাকি এটিকে যয়ীফ বলেছেন। এটা তাদের একটি জালিয়াতি । এ ধরণের মুনকাতি’ বা সূত্র বিচ্ছিন্ন হাদীসকে যয়ীফ বলা হাদীসের শাস্ত্রীয় জ্ঞান সম্পর্কে দৈন্যতা ও অজ্ঞতারই পরিচায়ক।

🌍মুরসাল হাদীস কি গ্রহণযোগ্য নয়?

ইমাম আবু দাউদ বলেছেন, وأما المراسيل فقد كان يحتج به العلماء فيما مضى مثل سفيان الثوري ومالك والأوزاعي حتى جاء الشافعي فتكلم فيه অর্থাৎ মুরসাল হাদীস দ্বারা প্রমাণ পেশ করতেন পূর্বেকার আলেমগণ, যেমন, সুফিয়ান ছাওরী, মালেক ও আওযায়ী। অবশেষে শাফেঈ এসে এতে আপত্তি করেছেন। ইবনে জারীর তাবারী বলেছেন, لم يزل الناس على العمل بالمرسل وقبوله حتى حدث بعد المأتين القول برده كما في جامع التحصيل অর্থাৎ আলেমগণ সর্বযুগে মুরসাল হাদীস গ্রহণ ও তদনুযায়ী আমল করে আসছেন। দুশ হিজরীর পরে এটি গ্রহণ না করার কথা ওঠে। তাবারী রহ.ও হয়তো শেষ বাক্যে ইমাম শাফেঈ রহ.এর প্রতি ইংগিত করেছেন। তবে শাফেঈ রহ.ও শর্তসাপেক্ষে মুরসাল হাদীসকে গ্রহণ করেছেন। ইবনে হাজার রহ. শারহুন নুখবা গ্রন্থে লিখেছেন, وقال الشافعي يقبل إن اعتضد بمجيئه من وجه آخر يبائن الطريق الأولى مسندا كان أو مرسلا অর্থাৎ গ্রহণ করা হবে যদি ভিন্ন কোন সনদে হাদীসটি বর্ণিত হয়ে থাকে। চাই সেই ভিন্ন সনদটি বিচ্ছিন্ন হোক বা অবিচ্ছিন্ন।

হাফেজ ইবনে তায়মিয়া র. লিখেছেন,

والمرسل الذي له ما يوافقه أوالذي عمل به السلف حجة باتفاق الفقهاء

অর্থাৎ যে সূত্র বিচ্ছিন্ন হাদীসের অনুকুলে অন্য কোন কিছুর সমর্থন থাকে কিংবা পূর্বসূরিগণের আমল পাওয়া যায় সেটি ফকীহগণের সর্বসম্মতিক্রমে প্রমাণযোগ্য। (আল ফাতাওয়াল কুবরা, ৪খ, ১৭৯পৃ)

যে সকল হাদীসবিদ মুরসাল হাদীস গ্রহণ করার ব্যাপারে কড়াকড়ি করেছেন তাদের সম্পর্কেও হাফেজ ইবনে হাজার লিখেছেন, متى توبع السيئ الحفظ بمعتبر، وكذلك المستور والمرسل والمدلس، صار حديثه حسنا لا لذاته، بل بالمجموع অর্থাৎ দুর্বল স্মৃতির অধিকারী, মাসতূর (যার দোষগুণ অজ্ঞাত), মুরসাল ও মুদাল্লাস সনদ বা সূত্রের যদি সমর্থন (অর্থাৎ অনুরূপ বর্ণনা) পাওয়া যায় নির্ভরযোগ্য রাবীর মাধ্যমে, তবে তাও হাসান মানে উন্নীত হবে। (নুখবাতুল ফিকার)

তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, এগুলো যেন সালাফ বা মহান পূর্বসূরিগণের সম্মিলিত আমল বা কর্মপন্থার খেলাপ না হয়। কারণ এমতাবস্থায় অবিচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত হাদীসও গ্রহণযোগ্য হবে না। (ভূমিকা দ্রষ্টব্য)

🌍ছ. তাবেয়ী মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল কুরাযীর বর্ণনা:

عن محمد بن كعب القرظي قال: كان الناس يصلون في زمان عمر بن الخطاب في رمضان عشرين ركعة يطيلون فيها القراءة ويوترون بثلاث.

অর্থ: মুহাম্মদ ইবনে কাব র. বলেন, হযরত উমর রা. এর যুগে রমযানে লোকেরা বিশ রাকাত পড়তেন। তাতে তারা দীর্ঘ কেরাত পড়তেন এবং তিন রাকাত বেতের পড়তেন। (ইবনে নাস্র মারওয়াযী, কিয়ামুল লায়ল, পৃ ৯১)

[সুত্রঃদলিল সহ নামাযের মাসায়েল।
লিখকঃমাওলানা আব্দুল মতিন (দাঃবাঃ)]

Share:

0 comments:

Post a Comment

Blog Archive

Definition List

Unordered List

Support